লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ইতিবৃত্ত

ফাইল ছবি

হাদি সিলেট : ক্রিকেটের ফ্যান হন কিংবা না ই হন, লর্ডস সম্পর্কে না জানাটা মোটামুটি আপনার অজ্ঞতাই বলা যায়। যদি লর্ডস সম্পর্কে না জেনে থাকেন তাহলে আজকের ফিচারটি  আপনার জন্য । লর্ডসের প্রতিষ্ঠাকাল,স্টেডিয়ামের ইতিহাস,জাদুঘর,লাইব্রেরী,টিকেটের দাম সবকিছুই নিচে আলোচনা করা হয়েছে। জানতে হলে প্রয়োজন আপনার মূল্যবান একটু সময় এবং পুরোপুরি মনযোগ।  অনেক কিছুই তো বললাম চলুন এবার মূল ব্যাপারটায় আসি।

লর্ডসের নামকরণ ও প্রতিষ্ঠাকালঃ বিশ্বের বিখ্যাত ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড’। ১৭৮৭ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত তৈরি হওয়া তিনটি স্টেডিয়ামের মধ্যে এটি তৃতীয়। এটি ১৮১৪ সালে লন্ডনের সেন্ট জন’স উড নামক স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্টেডিয়ামটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব’। মেরিলেবোন বা এমসিসির মালিক টমাস লর্ড এটি স্টেডিয়ামটি প্রতিষ্টা  করেন এবং নামানুসারেই এটির নামকরণ করা হয় ‘লর্ডস’।

১৮১৪ সালে এই স্টেডিয়ামের ইতিহাসের  প্রথম ম্যাচটি হয় মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব ও হার্টফোর্ডশায়্যারের মধ্যে। জেনে রাখা ভালো যে, বিশ্বকাপের ১০টি ফাইনাল ম্যাচ বিশ্বের সাতটি স্টেডিয়ামে অনুষ্টিত হয়েছে। তন্মধ্যে চারটি ম্যাচই আয়োজন করা হয়েছে লর্ডসে। ১৯৭৫,১৯৭৯,১৯৮৩ ও ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল  ম্যাচগুলোর গর্বিত আয়োজক এই লর্ডস।
২০১৪ সালে লর্ডস তাদের ২০০ বছর পূর্তি পালন করেছে।  এই দিন লর্ডসে এমসিসি এবং বহিঃবিশ্ব একাদশের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করা হয়। খেলায় এমসিসির অধিনায়ক ছিলেন ভারতের কিংবদন্তী ক্রিকেটার শচীন টেন্ডলকার ও বহিঃবিশ্ব একাদশের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন কিংবদন্তী লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন। খেলায় এমসিসির বিপক্ষে সাত উইকেটে হেরেছিল বহিঃবিশ্ব একাদশ।

গ্যালারির বিবরণঃ মোট আটটি স্ট্যান্ড নিয়ে নির্মিত লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের অধিকাংশ স্ট্যান্ডেরই  পুণনির্মান করা হয়েছে বিশ শতাব্দীর শেষের দিকে।

লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের আটটি স্ট্যান্ডের নাম হচ্ছেঃ-

১. গ্রান্ড স্ট্যান্ড।
২.ওর্য়ানার স্ট্যান্ড।
৩.কম্পটন স্ট্যান্ড।
৪.মিডিয়া সেন্টার।
৫. এ্যালান সেন্টার।
৬.এডরিচ স্ট্যান্ড।
৭.ট্যাভার্ন স্ট্যান্ড।
৮. মাউন্ড স্ট্যান্ড।

যাদের নকশায় স্ট্যান্ড গুলো সজ্জিত হয়েছেঃ ১৯৮৭ সালে মাউন্ড স্ট্যান্ডের নকশা করেন স্যার মাইকেল হপকিন্স। এরপর ১৯৯৬ সালে নিকোলাস গ্রিমশয়ের নকশায় গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮-১৯৯৯ মৌসুমে লর্ডসের মিডিয়া সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়। ‘রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস’ কর্তৃক মিডিয়া সেন্টার নির্মানের জন্য ১৯৯৯ সালে ‘স্টার্লিং পুরস্কার’ লাভ করে। ‘লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড’ বর্তমানে ৩২,০০০ দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়াম।

প্যাভিলিয়নের ইতিহাসঃ ১৮৮৯-৯০ মৌসুমে বিখ্যাত স্থপতি টমাস ভেরিটির নকশা অনুযায়ী ভিক্টোরিয়া যুগের স্থাপনা হিসেবে প্যাভিলিয়ন সহ লং রুমটি স্থাপিত হয়।  ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দ্বিতীয় স্তরের তালিকাভূক্ত ভবন হিসেবে ২০০৪-০৫ মৌসুমে পুণঃনির্মাণ পরিকল্পনায় আট মিলিয়ন পাউন্ড-স্টার্লিং বরাদ্দ করা হয়েছিল। প্রধানত এমসিসি’র সদস্যদের জন্য প্যাভিলিয়নটি তৈরী করা হয়েছে। ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য আসন, লং রুম, লং রুম বার, বোলার্স বার, সদস্যদের জন্য দোকানপাট ইত্যাদি সুবিধাদি এখানে রয়েছে। মিডলসেক্সের খেলার সময় প্যাভিলিয়নটি ক্লাবের সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এছাড়াও, প্যাভিলিয়নে পোষাক বদলের জন্য ড্রেসিং রুম, খেলা দেখার জন্য খেলোয়াড়দের ছোট্ট বারান্দার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দু’টো প্রধান ড্রেসিং বোর্ডে অনার্স বোর্ড আছে যাতে টেস্টে ব্যাটসম্যানদের সেঞ্চুরি ও ইনিংসে পাঁচ উইকেট এবং টেস্টে দশ উইকেট লাভকারী বোলারদের তালিকা উল্লেখ করা থাকে।
১৮৯৯ সালের ৩১ জুলাই একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে মন্টি নোবেলের বলে প্যাভিলিয়নে বল ঢুকিয়েছিলেন আলবার্ট ট্রট।

প্রথম ও সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচসমূহঃ লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচটি অনুষ্টিত হয়েছে ১৮৮৪ সালের ২১ জুলাই। সে ম্যাচে স্বাগতিক ইংল‌্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ টি খেলা হয়েছে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই।
প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচটি  অনুষ্টিত হয়েছে ১৯৭২ সালের ২৬ আগস্ট। সে ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া।  সর্বশেষ একদিনের ম্যাচ খেলা হয়েছে ২০১৪ সালের ৩১ মে।

লর্ডসের জাদুঘরঃ  জাদুঘর তো সব শহরেই আছে। কিন্তু শৃুধুমাত্র খেলাধুলা নিয়ে জাদুঘরের সংখ্যা বিরল। ১৯৫৩ সালে এইচআরএইচ ডিউক অব এডিনবরা লর্ডসে মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৬৪ সাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের যেমন টি-২০,আইপিএল সহ সবধরণের খেলার তথ্য সংগ্রহিত আছে এখানে। এই জাদুঘরের বিখ্যাত প্রদর্শনী হলো এ্যাশেজ। এই ক্ষুদ্র বস্তুটি ক্রিকেটের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু। ২০০৬/০৭ সালে ইংল্যান্ডে একটি প্রদর্শনী অনুষষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে এই ক্ষুদ্র বস্তটি দেখার জন্য ১০০,০০০ মানুষ ভিড় জমিয়েছিল।

জাদুঘরের টিকেট এবং কখন খোলা থাকেঃ এমসিসি জাদুঘর মূলত সারাবছরই খোলা থাকে। কিন্তু, লর্ডস জাদুঘর দেখার জন্য পূর্বে টিকেট নিতে হয়। তবে লর্ডসে খেলার দিন জাদুঘর দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ওইদিন ম্যাচ টিকেটকেই জাদুঘরের এন্ট্রি হিসেবে গণ্য হয়।

টিকেটের মূল্যঃ টেস্ট অথবা একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের দিন এবং ওডিয়াই ফাইনালের দিন জাদুঘরে প্রবেশ ফ্রি থাকে। তবে টি-২০ এবং অন্যান্য খেলার দিন ৩ ডলার দিয়ে টিকেট কিনতে হয়। প্রত‌্যেক ম্যাচেই ১  ডলার ছাড় দেয়া হয়।

জাদুঘরের নিয়মিত প্রদর্শনীঃ ১৯৮৩ সালে ভারতের জয়ের সেই বিখ্যাত জয়ের পর কাপিল দেব যে পতাকাটি উড়িয়েছিলেন সেই  পতাকাটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও এমসিসির অন্যান্য সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে  কিংবদন্তী ক্রিকেটার ভিক্টর ট্রাম্পার, জ্যাক হবস, ডন ব্র্যাডম্যান এবং শেন ওয়ার্ন সহ সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের স্পোর্টস কিট। সম্ভবত সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার ডাব্লিউ জি গ্রেস এর জীবন এবং কৃতিত্ব আছে লর্ডসের এমসিসি জাদুঘরে। ১৪০ বছর পর, এমসিসি ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক আইটেমগুলির তার সংগ্রহে উন্নত করতে অব্যাহত রয়েছে।

একমাত্র বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে আমিনুল ইসলামের ব্যাট জায়গা পেয়েছে লর্ডসের জাদুঘরে। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে যে ব্যাটটি দিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন আমিনুল, সেটা প্রায় জোর করেই তাঁর কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন ক্রিকেট সংগঠক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি। বলেছিলেন, ওটা জাদুঘরে দেবেন। সাজ্জাদুল আলম তাঁর কথা রেখেছেন, ব্যাটটি এখন লর্ডসের জাদুঘরে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সাক্ষী হয়েই আছে।

লর্ডস লাইব্রেরীঃ লর্ডসের মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) লাইব্রেরীতে রয়েছে ক্রিকেটের জন্য নিবেদিত প্রাণ বিখ্যাত সকল বই ও প্রকাশনা।  ক্রিকেট নিয়ে লেখা সর্বশেষ সকল বিখ্যাত বই থেকে শুরু করে ১৭,০০০ ম্যাগাজিনের শিরোনামের বিরল সব সংস্করণ আছে লর্ডসের লাইব্রেরীতে। ব্যাক্তিগতভাবে লেখা কিংবা নতুন বই কেউ লাইব্রেরীতে উপহার স্বরূপ দিতে চাইলে এমসিসি লাইব্রেরী তা সাদরে গ্রহন করে।
এমসিসি লাইব্রেরী মেম্বারদের জন্য ম্যাচের দিনগুলোতে খোলা থাকে। এবং ম্যাচের দিন ব্যতিত বই গুলো নিয়ে গবেষণার জন্য এটি খোলা থাকে।

যাতায়াতঃ লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডটি লন্ডন সিটি থেকে খুব কাছেই। বেকার স্ট্রিট থেকে ১ মাইলেরও কম দূরত্বে লর্ডসের অবস্থান। বাসে কিংবা টিউবে খুব সহজেই পৌছা যায়। সেন্ট জন’স উড হল সবচেয়ে কাছের টিউব স্টেশন (আনুমানিক 5 মিনিট হাঁটার রাস্তা) এবং বেকার স্ট্রিট, ওয়ারউইক এভিনিউ, মেরিলেবোন এবং এডগারওয়্যার রোড থেকে ১৫ মিনিটের হাঁটার রাস্তা পার করলেই দেখা মিলবে ‘লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে’র।



এ সংবাদটি 306 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here