মাইকেল ফেল্পস : ইতিহাস সেরা জলমানব

আমেরিকান স্পোর্টস ম্যাগাজিনের বিচারে তিনি সর্বকালের সেরা অলিম্পিয়ান। পুরো অলিম্পিক ক্যারিয়ারে যিনি ঝুলিতে ভরেন ২৮ টি পদক,যার মাঝে ২৩ টি হচ্ছে গোল্ড মেডেল।

মাইকেল ফেল্পস, যার জন্ম ১৯৮৫ সালের ৩০ জুন আমেরিকার বাল্টিমোরে। ৭ বছর বয়সেই বাবা মা সাতার এর স্কুলে ভর্তি করে দেন। তবে সেটা প্রয়োজনের তাগিদে যতটুকু শেখা দরকার ততটুকুই ছিলো। সেই সাঁতারের স্কুলেই সাঁতারের প্রেমে পড়েন ফেল্পস। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন একজন বিশ্বমানের সাঁতারু হওয়ার।

সেই থেকে স্বপ্ন পূরনের পথে যাত্রা শুরু করেন ফেল্পস। প্রথমে অনুর্ধ্ব-১২ এর সকল রেকর্ড ভেঙ্গে নিজের করে নেন। ২০০০ সালের সিডনী অলিম্পিক ফেল্পসের প্রথম অলিম্পিক টুর্নামেন্ট। ১৫ বছর বয়সেই আমেরিকার হয়ে সুইমিংপুলে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান তিনি। যদিও সেই অলিম্পিকে কোনো পদক অর্জন করতে পারেননি।

প্রথম অলিম্পিক টুর্নামেন্টের ক্ষুধা মেটাতেই কিনা পরের বছরের চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেকে প্রমান করে ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে সব রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন করে ইতিহাস রচনা করেন ফেল্পস।

২০০৪ সালের অলিম্পিক টুর্নামেন্ট থেকে নিজেকে দারুনভাবে প্রমান করতে শুরু করেন তিনি। ৬টি গোল্ড এবং ২ টি সিলভার জিতেন সেই টূর্নামেন্টে। সেই সময় থেকেই সুইমিং পুলে নিজের রাজত্ব তৈরী করতে থাকেন এই আমেরিকান।

সুইমিংপুলের আরেকজন লিজেন্ড এবং মাইকেল ফেল্পসের শৈশবের হিরো ইয়ান থর্পকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ‘আপনি কি মনে করেন, ফেল্পস পরবর্তী অলিম্পিকে ৮ টি ইভেন্টের সব কয়টি ইভেন্টেই স্বর্ন পদক জয় করতে পারে?’
উত্তরে থর্প বলেছিলেন…. ‘অসম্ভব।’

থর্পের অসম্ভব বলাটাই তাতিয়ে দে মাইকেল ফেল্পসকে। নিজের অনুশীলন এর মাত্রা এরপর থেকেই বাড়িয়ে দেন কয়েকগুন। তবে একটা বড়সড় ধাক্কা খান ফেল্পস ২০০৬ সালে। দুর্ঘটনাবশত ২০০৬ সালে তার ডান হাত ভেঙ্গে যায়। চিকিৎসক এর পক্ষ থেকে বলা হয় পুরোপুরিভাবে আগের মতো আর ডান হাতকে কাজে লাগাতে পারবেননা তিনি। সেই থেকে ফেল্পস আবার নিজেকে নতুন করে পায়ের সাহায্যে কিভাবে আরো ভালো ভাবে সাতার কাটা যায় সেই পদ্ধতি রপ্ত করতে থাকেন। সফলও হন এতে এবং ঘোষনা দেন ২০০৮ এর অলিম্পিকে তিনি স্পিৎজের রেকর্ড টা ভাঙ্গতে চান। উল্লেখ্য, স্পিৎজ ১৯৭২ সালে অলিম্পিকে সাতটি সোনা জিতে রেকর্ড করেন।

ঘোষনানুযায়ী ফেল্পস ২০০৮ সালের অলিম্পিকে ৮ টি ইভেন্টেই সোনা জিতেন এবং ভবিষ্যৎ বাণীকে বাস্তবে নামিয়ে আনেন,সাথে সাথে থর্পের বলা সেই অসম্ভব কে সম্ভব করে নেন।

২০১২ সালের অলিম্পিকেও নিজের ফর্ম ধরে রাখেন ফেল্পস। অনেকে তো ফেল্পসকে পুলে নামার আগেই প্রথম বলে ঘোষনা দিয়ে রাখতো। ১২ এর অলিম্পিকে ফেল্পস ৪ টি স্বর্ন এবং ২ টি রোপ্য পদক জেতেন। তখন তিন অলিম্পিক মিলে ফেল্পসের মোট পদক সংখ্যা ২২।

২০১২ এর অলিম্পিকের পরপর ই অবসরের ঘোষনা দেন মাইকেল ফেল্পস। কিন্তু যার চিন্তায়,ধ্যানে সব ক্ষেত্রে সুইমিং পুল এবং সাতার সেই মানুষ কিভাবে এতো তাড়াতাড়ি তার ভালোবাসাকে বিদায় জানাবেন? ফেল্পসও পারেননি পুরোপুরিভাবে বিদায় জানাতে। আবার ফিরে আসেন সুইমিংপুলে নতুন করে আরো ইতিহাস রচনা করবেন বলে।

২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে দখল করেন ৫টি স্বর্ন এবং একটি রোপ্য পদক। সব অলিম্পিক মিলিয়ে তখন তার পদক সংখ্যা দাড়ালো ২৮। যাতে গোল্ড মেডেল ২৩ টি। সব অলিম্পিক টুর্নামেন্ট মিলিয়ে একজন প্লেয়ারের পদক পাওয়ার ক্ষেত্রে যেটা রেকর্ড।

রিও অলিম্পিকের পর ইতি ঘটে ফেল্পস যুগের। আর কোনো অলিম্পিকে রেকর্ড ভাঙ্গা গড়ার খেলায় মেতে উঠবেন না সর্বকালের সেরা এই সাতারু। যেহেতু ১২ এর অলিম্পিকের পর বিদায় জানিয়ে আবার চেনা রুপে রিও অলিম্পিকে ফিরে এসেছিলেন দুর্দান্ত ভাবে সেই কথা মাথায় রেখে অনেকে আশা করেছিলেন ২০২০ এর টোকিও অলিম্পিকে দেখা গেলেও যেতে পারে ফেল্পসকে।

টোকিও অলিম্পিকে দেখা যাবে কিনা সেই প্রসংগে ফেল্পস বলেন, ‘সাঁতারে যখন আপনি একটি দিন মিস করবেন তখন একদিন এর সেই গ্যাপ টা পূরনের জন্য প্রয়োজন দুই দিন। আমি ৬ বছরে এই একটা দিন ই মিস করিনি,যা আমাকে এগিয়ে রেখেছিলো বাকি এথলেটদের চেয়ে, যারা রবিবারে ছুটিতে থাকতেন তাদের থেকেও। বর্তমানে আমি সুইমিংপুল এর বাইরে,যদি এখন ফিরি তবে পুরোনো জিনিসটাও আমি ফিরে পাবো না, পুরোনো আমিকে হারিয়ে ফেলেছি যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই।’

সুতরাং,আগামী অলিম্পিকে দেখা যাবে না এই জলমানবকে। অলিম্পিক গেমস,বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ,প্যান প্যাসিফিক চ্যাম্পিয়নশিপ সহ পুরো ক্যারিয়ারে ৮২ টি পদক জিতেছেন,যার মধ্যে স্বর্ন পদক ৬৫ টি।

বর্ণিল ক্যারিয়ারের ইতি টানিয়ে নিজেকে এখন কোচিংয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। সেই ক্যারিয়ার ও হোক খেলোয়ার ফেল্পস এর মতো বর্ণিল।
কোচ ফেল্পসের কোনো শিষ্য এবার মেতে উঠুক নতুন কোনো রেকর্ড ভাঙ্গা গড়ার খেলায়।



এ সংবাদটি 342 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here