‘ধরিত্রীর বুকে গ্লাভস হাতে আঁকিবুঁকি আঁকা অসামান্য শিল্পী জিয়ানলুইজি বুফন’

হাদি সিলেট : আমাদের মতো একজন মানুষ, নাম ‘শ্রী জগদীশ চন্দ্র বসু’ তিনি বৃক্ষের ভাষা বুঝতেন, পড়তে পারতেন তাদের ভেতরকটাকে। ‘জিয়ানলুইজি বুফন’ নামক বৃক্ষের ভেতরটা পড়তে আমাদের বসুজিকে দরকার নেই। সে প্রশস্থ বটবৃক্ষ, তারও আগে মানুষ। আমরা তাই পড়তে পারি তাঁকে।

মানুষেরই মনের ভাষা পড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্যতম দুষ্কর কার্য। আতশী কাচ আবার পরিষ্কার, ধবধবে, সুস্পষ্ট। বুফনের ভেতরটাও তেমনই। তাকে পড়তে তাই অসুবিধা হয় না। যা হয় তা ‘কষ্ট’। যা বেরোয় তা ‘দীর্ঘশ্বাস’। থেমে গেলেন? থেমেই গেলেন? না। থামেননি। তিনি থামতে পারেন না। না। থেমেছেন। মহাজাগতিক নিয়ম মেনে। থামার বাধ্যবাধকতা আছে বলে। দোটানায় পড়লেন? বুফনের দোটানা আরো বেশি যা স্রেফ প্রতীকী অর্থেই দোটানা। কান্নারা তাঁকে অবিরাম ডাকছে নিজেদের দলে, কান্নার কারণের অভাব নেই। বুৃফনের এই দোটানার টানাটানি তাই চলছে একটানা!
অভিনয়ের ক্ষেত্রে থিয়েটার অার্টিস্টদের আলাদা একটা চাহিদা থাকে। থাকে কেননা তারা থিয়েটার থেকেই অভিনয়ের অ আ ক খ শিখে আসেন, মুখস্ত করেন ধারাপাতের সবকটা পাতা। তাদের মুখস্ত পন্ডিত ভাবলে ভুল হবে, মস্ত ভুল। অভিনয়ের যাবতীয় কলাকৌশল প্রদর্শনে হয়ে উঠেন অনন্য, চরিত্রেই পান পরিচিতি। জিয়ানলুইজি বুফনও তেমন একজন। ফুটবলে থিয়েটারটা তার বয়সভিত্তিক দল। অনুর্ধ্ব-১৬ থেকে অনুর্ধ্ব-২৩; ইতালির সকল বয়সভিত্তিক দলের প্লেয়ার লিস্টে উঠিয়েছেন নিজের নাম। দেশের হাল ধরার আগে পোক্ত করেছেন নিজের হাত, চওড়া করেছেন কাঁধকে।
লেভ ইয়াসিন, ফুটবল সম্পর্কে যৎসামান্য জ্ঞান আছে কিন্তু নামটা শুনেনি এমন কেউ নেই। বিশেষত বর্তমান প্রজন্ম। ইন্টারনেট, ইউটিউবের কল্যাণে মাকড়সা ডাকনামের রাশান গোলরক্ষক ইয়াসিনের ভিডিও’ও দেখা হয়ে গেছে চলতি পৃথিবীর উঠতি বাসিন্দাদের। কোথাও তবু শূন্যতা থেকে যায়, ঠিকই পুঁড়তে হয় অপূর্ণতায়। ভিডিওতে দেখা দু’চার মিনিটের সাদাকালো শো চোখের তৃষ্ণা মেটায়, মনের তৃপ্তি নয়। অথচ এই প্রজন্ম নিজেদের মনকে তৃপ্ত করার খুব ভালো সুযোগ পেয়েছে, পেয়ে আসছে। একজন গোলরক্ষক আছেন যিনি গোলরক্ষকের সংজ্ঞা পাল্টে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। যিনি ফুটবল ছাড়েন চোখের জলে ভিজতে যেয়েও না ভিজে ! তাতে টিভিসেটে আবদ্ধ শিশুচোখসমগ্রের আগ্রহ হারাবার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে ! তাঁর বিদায়ে তৈরি হয় প্রবল বিষোদগার, তৈরি হয় শোকগাঁথা, তৈরি হয় কারো কারো স্তব্ধতার বিষে বিষাক্ত হবার কাহিনী। তিনি ‘জিজি’। চাপাকান্নাকে সঙ্গী করে অবসরে যাওয়া এক নিভৃতচারী মহানায়ক। সতীর্থ পিরলো একবার বলেছিল ফুটবলে তাঁর কোন দুর্বলতা নেই। শেষবেলায় মিথ্যেই প্রমাণিত হলেন পিরলো! ফুটবলই বুফনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। জানি, এহেন মিথ্যাচারে পিরলোও বেজার নন। সার্থকতার বীজ হৃদয়ে নিহিত।
বুফনের পেশাদারিত্ব কিংবা অর্জন নিয়ে চর্চা করতে যাওয়া নিছক সময়ক্ষেপণ। কিংবদন্তিকে নিয়ে সময়ক্ষেপণেও সুখ। তারা কতটা সুউচ্চে পৌঁছোলে তা সম্ভব ভাবা যায় না। নিজেকে নিয়ে কাউকে ভাবার সুযোগটাই কখনো দেননি বুফন। যা দিয়েছেন তা অবাক হবার সুযোগ। ইতালির সাবেক গোলরক্ষক ও কোচ দিনো জফ বলেই দিয়েছেন, ‘এমন ব্যক্তিত্ত্ব এবং প্রতিভাসম্পন্ন অভিষেক আমি কারো দেখিনি’। সতীর্থরা এমনি এমনি ‘গোলরক্ষকদের ম্যারাডোনা’ অাখ্যা দেননি। টাকার কাছে নাকি অাবেগ বিকোয়? সেসব সস্তা আবেগ। বুফন ছেড়ে যাননি জুভেন্তাসকে। উত্থান পতন জীবনের অংশ, যেমনটা ফুটবল। তাই কেলেঙ্কারির বোঝায় সিরি বি’তে অবনমিত হয়েও আঁকড়ে ছিলেন প্রাণের ক্লাব। বায়ার্ণের সাবেক ম্যানেজার ইয়ুপ হেইঙ্কেস বলেছন একদম যথার্থ! ‘জুভেন্তাসের সিরি বি’তে অবনমনের পর বুফন দেখিয়েছে টিমের প্রতি তার দায়িত্বশীলতা এবং নমনীয়তা। এটা সত্যিই বিশাল কিছু। বুফন আসলেই ইতিহাসের দূর্দান্ত একটা অংশ’।
ডিস্কাস থ্রোয়ার মা আর ভারোত্তোলক বাবার ঘরে ১৯৭৮ এর ২৮ জানুয়ারি জন্ম নেয়া সন্তানের ক্রীড়াপ্রেম রক্তকণিকাজুড়ে। দুইবোন ইতালির ভলিবল দলের খেলোয়াড়। রেকর্ডের রাজপুত্র বললেও ভুল হবে না। ইতালি আর তুরিনের বুড়ি জুভেন্তাসের ফুটবল ইতিহাসের অসংখ্য পাতায় তাঁর নাম। সবচেয়ে বেশি ম্যাচে (৭৯)  অধিনায়কত্ব, গ্লাভসজোড়াকে সঙ্গী করে সবচে বেশি ম্যাচ (১৭৫) মাঠে নামা। জুভদের হয়ে পাঁচশতাধিক ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপেও সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ তাঁরই। ইতালিরই আরেক ক্লাব পারমা’র যুবদলে শুরু, জুভেন্তাসে এখনো শেষের নাম নেই ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে চুমু খেয়ে সোনার গোলকের মাথায় নিজের ঠোঁটযুগলের রেখা এঁকে দেয়া বুফনের।
ফুটবল খেলাটি না থামলেও ভক্তদের হৃদয়ে আরেকপ্রস্থ রক্তক্ষরণে ক্লাব জুভেন্তাস থেকেও তিনি থামবেন। লেভ ইয়াসিনের মতো তিনিও একদিন সম্পূর্ণ অতীত হবেন। সময় দেবেন প্রিয় পরিবারকে। মাতবেন হাসি আনন্দে। আর ইতিহাস মাতবে তাকে নিয়ে, এতকাল ধরে বিরতিহীন সেবা দেওয়া এক মহীরূহকে নিয়ে। কালের পাতায় স্বর্ণাক্ষ্যরে লিপিবদ্ধ হবেন তিনি, থাকবে তাঁর ছবিও। তখন আবার বিশারদরা ব্যস্ত হবেন ক্যাপশন নিয়ে। জুতসই এক ক্যাপশনের প্রয়োজনীয়তা হবে অপরিহার্য।
ক্যাপশনটা হয়ত এমন হতে পারে-
‘কেউ কেউ দক্ষ হয়, দক্ষতর হয়,
কেউ কেউ গোলবারের অতন্দ্রপ্রহরী হয়,
কিন্তুু জিয়ানলুইজি বুফন একজনই হয়।’


এ সংবাদটি 1218 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here