টাইগারদের প্রতিটি জয়ে ফিরে আসেন রানা

বাইশগজের সবুজ গালিচা মাতিয়ে বেড়াতেন আনন্দের সাথে, কখনো মাশরাফির পিঠে চড়ে বসতেন কিংবা সৈয়দ রাসেলের সাথে খুনসুটি। সারাক্ষন হাসিটা লেগেই থাকতো ঐ মায়াবী চেহারাটাতে। ড্রেসিংরুম,মাঠ কিংবা আড্ডা সব জায়গাতেই রানা ছিলেন, থাকবেন চিরদিন। কখনো বন্ধু মাশরাফির রাতের ঘোরে স্বপ্ন হয়ে উপস্থিত হন রানা। আতঁকে উঠেন মাশরাফি! চোখ কচলে আরেকবার তাকান চারদিকে ‘রানা,তুই কবে আসলি? ভাই আমার।’ একটু পরই হয়তো ভুল ভাঙ্গে মাশরাফির ‘রানা কোথায় ? আহ কোথায় মানজার?’ স্বপ্নে বারবার মাশরাফির সামনে এসে উধাও হলে বাস্তব মাশরাফিতে বিদ্যমান রানা। হ্যাঁ, প্রতি বছর ১৬ ই মার্চ এলেই আরেকটিবার কাঁদিয়ে যান মাশরাফিকে। কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী বাঙ্গালীকে। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেন খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের ‘মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ডের দিকে’, ওখানেই আছেন রানা।

মাশরাফি,রাসেলদের প্রিয় রানা।আমাদের প্রিয় রানা। আচ্ছা শুনবেন ওই রানার ওই স্ট্যান্ডে চলে যাওয়ার গল্পটা। না, থাক কেউ কি চায় আরেকটিবার চোখের জলে ভাসতে? আচ্ছা তাহলে ছোট করেই বলি… ১৬ ই মার্চ… প্রতিদিনের মত বাইক চালিয়ে নিজের প্রিয় বাসায় ফিরছেন মানজার। পিছনে উদীয়মান ক্রিকেটার সেতু। বাসায় মা অপেক্ষা করছেন প্রিয় গরুর মাংস রেঁধে। হ্যাঁ, ঝাল গরুর মাংস ভুনা ছেলেটার খুব প্রিয় ছিলো। বাইক চলছে তো চলছেই। সাই সাই করে, সেই ছেলেবেলার মতোই দুরন্তভাবে নিয়ন্ত্রন করছিলেন প্রিয় বাইকটা। তখন কি একটুও চিন্তা করছিলেন প্রিয় মাশরাফির কথাটা ‘একটু সাবধানে চালাস রানা!’ তো হঠাৎ থমকে গেলো আবহাওয়া, থমকে গেলো নড়াইল, থমকে গেলো পুরো বাংলাদেশ, থমকে গেলো বাংলাদেশ ক্রিকেট। হ্যাঁ, থমকে গেছে মাশরাফি,রাসেলদের আড্ডার পরিবেশটা। মাশরাফি কি তখনো অনুভব করতে পেরেছিলেন ‘রানা নেই, বন্ধু নেই।’ হঠাৎ দেশ থেকে ফোন, ওপাশে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। এপাশ থেকে শোনা যাচ্ছে ‘হ্যাঁ,সুমন।

রানা বাইক এক্সিডেন্ট করেছে।’ বাকিটা বুঝতে সময় লাগে না বাশারের।নিজের মনটাকে প্রচন্ড শক্ত করে রাখলেন। ভাবলেন কিভাবে দিবেন এ খবর মাশরাফিকে? তবুও ডাকলেন “ম্যাশ,এই দিকে আয়।” এক কোনায় ঢেকে নিয়ে বললেন কথাটা। ক্ষনিক পরেই পৃথিবী উল্টে যাওয়া মাশরাফিকে দেখলো সবাই। প্রিয় বন্ধু, প্রিয় ভাই, প্রিয় সতীর্থকে হারানোর বেদনাটা সেদিন ছারখার করে দিয়েছিলো পাগলাটার পর্বতসমান মনটাকে। দু’চোখ সেদিন বাধ ভেঙ্গে অঝর ধারায় কথা বলতেছিলো ‘তুই আগে ঘুমা। তারপর আমি ঘুমাবো’ সত্যিই সেই যে এই বলে ঘুমালেন রানা। আর কি জেগে উঠলেন? একবারও কি আর বলছিলেন কথাটা? হ্যাঁ,কেউ শুনতে না পেলেও মাশরাফি আজো শুনতে পান “কৌশিক তুই আগে ঘুমা,আমি তারপর বাতি নিভিয়ে ঘুমাবো” বাতিয়ে নিভিয়েই ঘুমিয়ে আছেন মানজুর। সেই বাতি নেভানো অন্ধকারে আজো হয়তো বন্ধুকে খুঁজে বেড়ান ম্যাশ।

আহ বন্ধু ! কোথায় বন্ধু…! তারপর কেটে গেলো বহুদিন। ক্রিকেট মাঠে এখন আর দেখা যায় না ‘৯৬’ জার্সিখানা কিংবা বাঁহাতি সেই স্পিনটা, চোখে পড়ে না হাঁটু সামান্য ভেঙ্গে ডিফেন্স করার চিত্রটা। আজ বেঁচে থাকলে হয়তো সাকিব আল হাসানের সাথে জমাট লড়াই করতেন কিংবা বুকে টেনে বলতেন ‘ফয়সাল, আজ তুই কাল আমি।’ হ্যাঁ, ভাই ভাইয়ে লড়াইটাও এখন শত চাইলেও হবে না। তবুও এই যে আরেকজন সাকিব ঠিক মানজার রানা হয়ে দখল করছেন তিন সিংহাসন। এটা দেখেই হয়তো ওপারে হিউজ, রমন লম্বাদের দেখিয়ে প্রান খোলা সেই হাসিটা দেন মানজার। আজ হয়তো ৪০০ উইকেট পেতেন কিংবা খেলতেন শততম টেস্ট। মেতে উঠতেন বুনো উল্লাসে। নিয়তির নির্মম লিখন, তা আর না হলেও ওপারে ফিল হিউজকে কিংবা রমন লম্বাকে আউট করেন বারবার আর ফিরে আসেন কৌশকের স্বপ্ন হয়ে সে খবরটাই দিতে। আজ যখন বাড়ির পাশে মাঠে ‘ওরা ১১ জন’ গর্জন করে। তখন হয়তো অভিমানেও রানা দাঁত কেলিয়ে হাসে। বন্ধু মাশরাফির সাথে তাল মিলিয়ে বলে “ধরে দিবানি।

” রানা কি সত্যিই মারা গেছেন? কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক প্রিয় মাশরাফি আর কোটি ক্রিকেট ভক্তের বিশ্বাস ‘রানা বেঁচে আছে। হ্যাঁ, বাংলাদেশের প্রতিটা ম্যাচে ফিরে আসে রানা।’ এভাবেই ফিরে আসবেন একবার, বারবার। বাংলাদেশের জয়ের অনুপ্রেরনা হবেন কিংবা তাতিয়ে দিবেন কলার উচিয়ে দৌঁড়ে চলা পাগলাটাকে। অতঃপর হাসবেন বিজয়ের হাসি। অপার অসীম অনন্তে এভাবেই ভালো থাকুন প্রিয় মানজারুল ইসলাম রানা…



এ সংবাদটি 585 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here