জ্যাক হবস : দ্যা মাস্টার অফ ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ৮৩৪ ম্যাচে ৫০.৭০ গড়ে ৬১,৭৬০ রান, ১৯৯ টি সেঞ্চুরি, ২৭৩ টি হাফসেঞ্চুরি। হ্যাঁ,একদম ঠিক পড়েছেন, এই হলো জ্যাক হবসের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের পরিসংখ্যান।

ইংরেজীতে একটা কথা আছে, ‘স্ট্যাটস নেভার লাই’। হবসের ক্ষেত্রে কথাটি ভুল। এমনকি এই অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান ও ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না জ্যাক হবস কে। উইজডেনের গত একশ বছরের সেরা পাঁচ ব্যাটসম্যানের একজন,সর্বকালের সেরা ওপেনার জ্যাক হবস ছিলেন তৎকালীন যুগের প্রথম পেশাদার ক্যাপ্টেন (তখন ক্যাপ্টেন হতেন কেবল এমেচার রা)। দ্রুতগতির ফুটওয়ার্ক, বিভিন্ন শট খেলার সহজাত প্রবনতা, ধ্বংসাত্মক গুগলি বলের বিরুদ্ধে দারুন সফলতা তাকে দিয়েছিলো সর্বকালের সেরা ওপেনারের তকমা। ক্লাসিকাল শটের সাথে কার্যকরী ডিফেন্সের এক দারুন সমন্বয়কারী হবস ব্যাটসম্যান দের জন্য ডিফিকাল্ট পিচগুলোতে ছিলেন আরো বেশী সফল। স্যার হাবার্ট সাটক্লিফের সাথে তার ওপেনিং জুটির গড় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছিলো সর্বোচ্চ, তার অবসরের ৮৫ বছর পর পর্যন্ত।

তৎকালীন যুগে ক্রিকেট বলতেই ছিলো শৌখিন অভিজাতদের খেলা। হবসের মতো পেশাদার ক্রিকেট খেলতেন কেবল শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ৷ শ্রমিক এবং শৌখিন দের ট্রাভেল টিকেট,ড্রেসিং রুম এমনকি মাঠে প্রবেশ করার গেটও ছিলো আলাদা। পেশাদার দের মুলত দলে নেয়া হতো বোলিং করার জন্যই। একজন পেশাদার ক্রিকেটার হয়ে সে যুগে ইংল্যান্ডের হয়ে অধিনায়কত্ব করা কল্পনারও অতীত ছিলো। জ্যাক হবস তাই করে দেখান তার অসাধারন ব্যাটসম্যানশীপের কল্যানে। তার ব্যাপারে স্যার পেলহাম ওয়ার্নার বলেছিলেন,

“এ প্রফেশনাল হু এক্সাক্টলি ব্যাটস লাইক এন এমেচার।”

ফার্স্ট ক্লাসের মতো জাতীয় দলের হয়েও হবস ছিলেন অনবদ্য। ১৯০৮/৯ অ্যাশেজ স্কোয়াডে প্রথমবারের মতো ডাক পান হবস। ইংল্যান্ড ৪-১ এ সিরিজ হারলেও প্রথম ওভারসীজ সিরিজে হবস ৩০২ রান করেন ৪৩.১৪ গড়ে।

অস্ট্রেলিয়ার ফিরতে ট্যুরে অবশ্য ফ্লপ ছিলেন তিনি। তবে হবস সর্বকালের সেরাদের কাতারে আসেন পরবর্তী দক্ষিন আফ্রিকা ট্যুরে। দক্ষিন আফ্রিকার বিখ্যাত ৪ ‘গুগলি কোয়াট্রেট’ এবং এক লেগির সামনে যখন পুরো ইংল্যান্ড দল অসহায় আত্মসমর্পন করছিলো তখন হবস একাই দাঁড়িয়ে যান চীনের প্রাচীর হয়ে৷ সেই সিরিজে ৬৭.৩৮ গড়ে ৫৩৯ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন হবস,তার ধারেকাছেও ছিলোনা।

তবে হবস তার সেরা সময়টা কাটান ১৯১১/১২’র অ্যাশেজে৷ ৯ ইনিংসে ৮২.৭৫ গড়ে করেন ৬৬২ রান। যার মধ্যে ছিলো তিনটি ম্যাচ উইনিং সেঞ্চুরি। ফলাফল- ইংল্যান্ড ৪-১ ব্যবধানে জয়ী। পরের দক্ষিন আফ্রিকা সফরে ৬৩.২৯ গড়ে ৪৪৩ রান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হবসের ক্যারিয়ার থেকে কেড়ে নেয় ছয়-ছয়টি বছর। এসময় রয়াল এনফোর্সমেন্টেরর হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন তিনি। বিশ্বযুদ্ধের পর হবস ফিরে আসেন আরো পরিনত আরো ভয়ংকর হয়ে। হবসের ক্যারিয়ারের অধিকাংশ রান এসেছে তার ৪০ বছর পেরুবার পর। ৪০ থেকে ৫০ এই দশ বছরে হবস করেন প্রায় ২৬০০০+ রান এবং ৯৮ টি সেঞ্চুরি। জাতীয় দলের হয়ে হবস ৬১ ম্যাচে ক্রিকেট ইতিহাসের ৬ষ্ঠ সর্বোচ্চ ৫৬.৯৪ গড়ে করেন ৫৪১০ রান।

হবস ছিলেন ইতিহাসের প্রথম পরিপূর্ণ ব্যাটসমেন, ব্যাকফুটে সর্বকালের সেরাদের একজন, কাট, পুল এবং নিয়ন্ত্রিত হুক শটে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সব ধরনের শট খেলায় পারদর্শী।টেম্পারমেন্ট, শট সিলেকশন এবং গ্যাপ খেলায় যার জুড়ি মেলা ভার। এজন্য তাকে ভুষিত করা হয় ক্রিকেটের ‘দ্যা মাস্টার’ উপাধি তে। সব ধরনের পিচেই হবস ছিলেন সমান সফল।

ক্রিকেট সাহিত্যের শেক্সপিয়ার নেভিল কার্ডাস হবস সম্পর্কে বলেছিলেন,

‘On all kinds of pitches, hard and dry, in this country or in Australia, on sticky pitches here and anywhere else, even on the “gluepot” of Melbourne, on the matting of South Africa, against pace, spin, swing and every conceivable device of bowlers Hobbs reigned supreme.’

১৯৫৩ সালে প্রথম পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন জ্যাক হবস। যে পেশাদার ক্রিকেটারদের একসময় কুকুরের সাথে তুলনা করতেন শৌখিন ইংরেজরা।

১৯৬৩ সালে ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন স্যার জ্যাক হবস,তার স্ত্রীর মৃত্যুর কিছুদিন পর। ওপারে ভালো থাকবেন “দ্যা মাস্টার”।



এ সংবাদটি 312 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here