ক্রিস গেইল : দ্যা ইউনিভার্স বস

আমি ‘ইউনিভার্স বস’,গর্বের সাথেই নিজেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় নিজের মহাত্ব এভাবেই প্রকাশ করেছেন। ব্যাট কে তলোয়ার বানিয়ে যেভাবে কচু কাটা করেন বোলারদেরকে সেই দৃশ্যের সাথে পরিচয় থাকলে তার ‘ইউনিভার্স বস’ তকমা তে কারোরই আপত্তি থাকার কথা না,অবশ্য কেউ আপত্তি তুলেও না।
তিনি ক্রিস্টোফার হেনরী গেইল, যাকে আমরা চিনি ক্রিস গেইল নামে। ক্যারিবিয়ান সাগর পাড়ের এই ক্রিকেটীয় দৈত্যর ব্যাটিংয়ের ফ্যান রয়েছে বিশ্বজুড়ে। নান্দনিক ব্যাটিং দিয়ে বিনোদন দিয়ে যাচ্ছেন দুই দশক ধরে, আমরাও বিনোদিত হচ্ছি।
১৯৯৯ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক, সেই থেকে দলের ও নিয়মিত সদস্য। ২০ বছর পাড়ি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। যদিও বোর্ডের সাথে ঝামেলায় শেষ কয়েক বছর থেকেই অনিয়মিত দেশের জার্সিতে। তবে টি-টুয়েন্টির ফেরিওয়ালা হয়ে ঘুরছেন দেশে দেশে,নিজের তাণ্ডবলীলা বয়ে দিচ্ছেন একের পর এক।
ক্যারিবিয়ানরা বরাবর ই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ওস্তাদ। ইতিহাসের সবচেয়ে আক্রমনাত্বক ব্যাটসম্যান যাকে ধরা হয় সেই ভিভ রিচার্ডস থেকে শুরু করে হালের রুসেল,লুইস,হেটমায়ার,পাওয়েল ও ক্রিকেটে ক্যারিবিয়ানদের উপহার। যেই ক্যারিবিয়ানরা একের পর এক ড্যাশিং ব্যাটসম্যান উপহার দিচ্ছে সেই জায়গা থেকে ক্রিস গেইল নিজেকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন যেখানে আক্রমনাত্বক ব্যাটিংয়ের সমার্থক শব্দ ক্রিস গেইল হয়ে গিয়েছে।
হোম কিংবা এওয়ে,ওয়ানডে কি টি টুয়েন্টি,রাবাদা কিংবা স্টার্ক অথবা সাকিব এবং অশ্বিন যাই হোক ক্রিস গেইল টাচে আছেন এমন অবস্থায় পৃথিবীর কোনো বোলিং ইউনিট ই শক্তিশালী নয়। ব্যাটিং কিংবা বোলিং পিচ সেখানে কোনো বিষয় নয়। ক্রিস গেইল টাচে আছেন এবং ক্রিজে এখন ব্যাটিং করছেন এমতাবস্থায় ম্যাচটা ওয়ান ম্যান শো তে পরিণত হবে। পক্ষ কিংবা প্রতিপক্ষ তখন গেইলের বাহারি সব ছক্কার ফুলঝুরি দেখে মুগ্ধ হওয়াতে ব্যাস্ত।
টি টুয়েন্টিতে একজন ব্যাটসম্যান এর পক্ষে যতসব রেকর্ড গড়া সম্ভব তার মোটামোটি সব ই ক্রিস গেইলের দখলে। ফ্রাঞ্চাইজি লীগ গুলোতে ক্রিস গেইল প্রথম পছন্দ। বিশ্বক্রিকেটে যতো গুলো টি টুয়েন্টি লীগ হয় তার সবকটাতেই রয়েছে গেইলের বিচরণ। দেশের হয়ে টি টুয়েন্টির শিরোপা উচিয়ে ধরেছেন দুইবার। শুধু টি-টুয়েন্টি কিংবা ওয়ানডেতেই উজ্জ্বল গেইল এরকম টা ভাবলে ভুল। চারজন ক্রিকেটারের একজন হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে হাকিয়েছেন দুই বার ট্রিপল সেঞ্চুরী।
২০০৫ এ দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে ৩১৭ এবং ২০১০ এ শ্রীলংকার বিপক্ষে ৩৩৩ রানের ইনিংস খেলেন এই ব্যাটিং দানব। টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ইনিংসের প্রথম বলে ছক্কা মেরে ব্যাতিক্রমী একটি রেকর্ড গড়েন তিনি।
ক্রিস গেইল ই প্রথম ব্যাটসম্যান যিনি ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরী হাকান। টি-টুয়েন্টির ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরীয়ান এর নাম ও ক্রিস গেইল, তাও মাত্র ৬৬ বলে। দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডেও ক্রিস গেইল এর নাম আসবে যদিও এখানে তার সংগী ভারতের যুবরাজ সিং।
আন্তর্জাতিক এবং ঘরোয়া লিগের সব মিলিয়ে টি টুয়েন্টি ক্যারিয়ারে ছক্কা হাকিয়েছেন ৮০০ এর ও বেশি। প্রথম টি -টুয়েন্টি প্লেয়ার হিসেবে ১০০০০ রান এর মাইলফলক ও অতিক্রম করা হয়েগেছে ইতিমধ্যে। ক্রিকেটের সব ফরম্যাটে সেঞ্চুরী করা প্রথম প্লেয়ার ও তিনি।
গেইলকে আলসে ক্রিকেটার ও বলা চলে। সিংগেল রান নিতে তার ভীষন অনীহা। ব্যাটিং যখন করেন সেখানে ফুটওয়ার্কের বালাই নেই,ক্রিকেটীয় ব্যাকরনের ও ধার ধারেন না, নিজের মতো করে খেলেন,কব্জির মোচড়ে সীমানা ছাড়া করেন বলকে।
এরকম করে খেলেই তো তিনি ক্রিস গেইল! এরকম করে খেলেই তো বিশ্বজুড়ে তৈরী হয়েছে তার এতো ফ্যান। দুই দশক ধরে এভাবেই মাতিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বক্রিকেটকে।
দর্শকদের কাছে আধুনিক কালে ক্রিকেট মানে চার-ছক্কার ফুলঝুরি। আর সেই চার ছক্কা দিয়েই তো ক্রিস গেইল বিনোদন দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত।
বয়স চল্লিশ ছুই ছুই, ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ এর পর অবসরে চলে যাবেন এমন ঘোষনাও দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত সিরিজ কাটানোর পর সেই ঘোষনা থেকে সরে আসার আভাস দিয়েছেন।
ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা আমুদে হয়,ক্রিস গেইল ও তার বাইরে নন। ব্যাট হাতে তান্ডব চালানো গেইল ব্যাক্তিজীবনে মজার একজন মানুষ। আফগানিস্তানের সাথে ম্যাচ হেরেও প্রতিপক্ষের নবী -রাশিদের সাথে কোমর দুলিয়ে নাচতে পারা মানুষটাকে কিভাবে অপছন্দ করা যায়?
আসছে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বড় ভরসার নাম গেইল। টি-টুয়েন্টি ট্রফি দুইবার উচিয়ে ধরলেও ওয়ানডে বিশ্বকাপের ট্রফি এখনো ছোঁয়া হয়নি তার।
সম্ভবত এটাই শেষ সুযোগ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের। বর্ণিল ক্যারিয়ারে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের আক্ষেপ টা নিশ্চয়ই পূরন করতে চাইবেন গেইল। সোনালী ট্রফি হাতে নিশ্চয়ই গেইলকে বেমানান লাগবে না! ক্রিকেটেও যে এরকম ব্যাতিক্রম চরিত্র বারবার আসে না।


এ সংবাদটি 105 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here