একজন শহীদ জুয়েল এবং আমাদের ক্রিকেট 

 
দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের ক্যাপ্টেন হমু, ওপেনিং’এ নামমু। আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার।”
নারায়ণগঞ্জ এর সিদ্ধিরগঞ্জে পাক সেনাদের অতর্কিত হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে থাকাকালীন একজন ক্রিকেটার মুক্তিযুদ্ধার শেষ আকুতি ছিলো এটি। সেখানে’ই তার মৃত্যু হয়। আজকে যেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে আমাদের গর্বে বুক ফুলে উঠে যিনি না থাকলে হয়তো সাকিব, তামিম, মুশফিক কিংবা একটা বাংলাদেশ থাকতো না, তাকে নিয়ে গর্ব’তো দূরে থাক তাকে ক’জনইবা মনে রেখেছি আমরা?
হ্যাঁ বলছি ১৯৫০ সালের ১৮ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে জন্ম নেয়া এবং ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ সালের আজম ট্রফিতে পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে যিনি ব্যাট হাতে মাঠে নেমে ওপেনিং অর্ডারে দারুণ স্টাইলিশ ব্যাটিংয়ে নজর কাড়তেন সবার সেই আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের কথা। সবাই যাকে জুয়েল নামে চেনেন।
পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কায়েদে আজম ট্রফিতে ৭টি ম্যাচ খেলেছিলেন শহীদ জুয়েল। আজাদ বয়েজের হয়ে খেলেছেন দীর্ঘ দিন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে সর্বশেষ খেলেছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। এমন দুর্দান্ত ব্যাটিং স্টাইল থাকা সত্ত্বেও শহীদ জুয়েলের জায়গা হয় নি তৎকালীন পাকিস্তান দলের জাতীয় দলে। কেন ই বা হবে? তিনি যে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের। তার থেকে বড় কথা তিনি যে দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার হাত থেকে বাঁচাতে ব্যাট ছেড়ে তুলে নিয়েছিলেন স্বাধীনার পতাকাবাহী অস্ত্র। তাই তো ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্টে গভীর রাতে পাক সেনাবাহিনীর তাকে ধরে নিয়ে যায় তৎকালীন তেজগাঁওয়ে এমপি হোস্টেলের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সেখান থেকে আর ফেরেন এই বীর বিক্রম। আর স্বাধীন দেশের হয়ে ব্যাট ধরা হয় নি তার। ওপেনিংয়ে নেমে ছক্কা হাঁকানো কিংবা দেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন সে দিন ভস্ম করে দিয়েছিল পাক হানাদার বাহীনি।
তৎকালীন পাকিস্তানী জেনারেল ইয়াহিয়ার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পূর্বে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র কালজয়ী গানের সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদ, আজাদ, বদি, রুমিসহ আরও যে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল, তার মধ্যে একজন ছিলেন শহীদ আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা ক্র‍্যাক প্ল্যাটুনের একজন বীর সদস্য ছিলেন। তারই অংশ হিসেবে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। কিন্তু সেখানে যুদ্ধের এক পর্যায়ে আঙুলে গুলি লাগে এই বীর শহীদের। আহত জুয়েলকে ধরে নিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। ক্র্যাক প্লাটুনের তথ্য জানার জন্য তার ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন শুরু করে তারা। কিন্তু শহীদ জুয়েলের মুখ থেকে কোন তথ্য বের করতে না পেরে একপর্যায়ে কেটে ফেলা হয় তার দুটি আঙুল। জুয়েলের চিৎকারে কেঁদে উঠে সিদ্ধিরগঞ্জের পশুপাখিরা। যে হাত দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার ওপেনার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সে হাতেরই আঙুল কেটে দিয়েছিল ৭১ এর বর্বর পাকিস্তানি বাহীনি। কিন্তু শেষ পর্যায়ে কোন তথ্য উপাত্ত তার মুখ থেকে বের করতে না পারায় হত্যা করা হয় তাকে।
পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে শহীদ জুয়েলকে দেয়া হয়েছিল ‘বীর বিক্রম’ খেতাব। তাছাড়া বর্তমানে আমরা মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে শহীদ মুস্তাক ও শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড নামে যে দুটি স্ট্যান্ড দেখতে পাই তার একটি এই শহীদ জুয়েল নামে। এছাড়াও শহীদ জুয়েলকে স্মরণ করে ৭১ নাম্বারের জার্সিটি তুলে রেখেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মানে, বাংলাদেশ দলের আর কোন ক্রিকেটারই এই সংখ্যার জার্সি পরে খেলতে পারবেন না।


এ সংবাদটি 360 বার পড়া হয়েছে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here